আজ  বুধবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৮

অভিযান শেষ, নিহতদের একজন কি জঙ্গি মূসা! নারী জঙ্গির মৃত্যু আগুনে পুড়ে, পুরুষ বিস্ফোরণে

4সিলেট অফিস :

সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় আতিয়া মহলে পাঁচ দিন ধরে চলা জঙ্গি বিরোধী অভিযান শেষ হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। পাঁচতলা ভবনটি পুলিশের হাতে বুঝিয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী। সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এক ব্রিফিংয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফখরুল আহসান বলেন, ‘আমরা সফলভাবে অভিযান শেষ করেছি। পুলিশের কাছে ওই ভবনের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

 

সিলেট নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার রোকন উদ্দিন সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে  বলেন, ‘বিকাল সোয়া ৫টায় তারা ওই ভবনের দায়িত্ব বুঝে পেয়েছেন।’ জানা গেছে, গতকাল ওই ভবন থেকে উদ্ধার করা দুই লাশের মধ্যে ভয়ঙ্কর জঙ্গি মুসাও রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ লাশের ডিএনএসহ অন্যন্য বিষয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছে। তবে সেনাবাহিনীর কামান্ডোদের সাথে লড়াইয়ের সক্ষমতা ও ঐ ভবনে যেসব বিস্ফোরক, আইইডি লাগানো ছিল তাতেই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে দুর্ধর্ষ মূসাই হয়তো ওই আস্তানায় ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নিহত যে চার জঙ্গির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তাদের একজনের সঙ্গে মূসার চেহারার মিল রয়েছে।

 

এদিকে গতকাল আতিয়া মহলে বিস্ফোরক শনাক্ত করতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেনাবাহিনী। যদিও গতকালও ভেতরে থেমে থেমে ৪টি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। গত সোমবার পুলিশের কাছে             হস্তান্তর করা দুই জঙ্গির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। নিহত চার জঙ্গির মধ্যে একজন পুরুষের মৃত্যু হয়েছে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে, আর এক নারী নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে পুলিশের ধারণা। দু’টি লাশের ময়নাতদন্তের পর কোতোয়ালি থানার ওসি সোহেল আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘লাশ দু’টি চেনার উপায় নাই। অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবেই তাদের ময়নাতদন্ত হয়েছে। এখন লাশ দুটি রাখা হবে হিমাগারে। পরিচয় নিশ্চিতের জন্য ডিএনএ নমুনা ও আঙুলের ছাপসহ সম্ভাব্য সবকিছু রাখা হয়েছে।’ অন্য লাশ দু’টি গতকাল বিকেলে ওসমানী মেডিক্যালে পাঠানো হয়েছে। আজ ময়নাতদন্ত হতে পারে। এদের একজনের সঙ্গেই জঙ্গি মূসার মিল পাওয়া গেছে।

 

আতিয়া মহল-এ পাঁচদিনের সফল জঙ্গি অভিযানে এক নারীসহ চার শীর্ষ জঙ্গি নিহত এবং জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ায় সিলেটসহ সারাদেশে স্বস্তি ফিরে এসেছে। গতকালও আতিয়া মহলে অভিযান অব্যাহত রাখে সেনাবাহিনীর কমান্ডো টিম। এর আগে সোমবার এক নারীসহ দুই জঙ্গির লাশ উদ্ধার করে সেনা কমান্ডোররা। গতকাল দুপুর ১টার দিকে সেখান থেকে চারটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। অবশ্য সোমবার সেনাবাহিনীর প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ভবনের ভেতরে প্রচুর বিস্ফোরক বিপজ্জনক অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

 

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) জেদান আল মুসা জানান, সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো দল গতকাল  বিস্ফোরক দ্রব্য নিস্ক্রিয় করার কাজ করেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে থাকা বিস্ফোরকগুলো নিষ্ক্রিয় করতে গিয়ে ওই ৪টি বিস্ফোরণ ঘটে। তবে ওই ভবনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে।

 

দুই জঙ্গির ময়নাতদন্ত :আতিয়া মহলে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে নিহত নারীসহ আরো এক জঙ্গির ময়নাতদন্ত সমপন্ন হয় গতকাল বেলা ৩ টার দিকে। তাদের দুজনের শরীরে মাংস বলতে কিছু নেই। সব পুড়ে গেছে। পুরুষ জঙ্গির পায়ে সেন্ডেল, টি কালারের জামা ও প্যন্টের কিছু অংশ পাওয়া গেছে। নিহতদের ডিএনএ টেষ্টের জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

 

লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ওই পুরুষের উচ্চতা আনুমানিক ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। গোলাকার মুখমণ্ডল ছিল আগুনে পোড়া। মাথার সামান্য চুল ও মুখে কিছু দাড়ি ছিল। ওই ব্যক্তির পরনে ছিল কালো জামা, দুই পায়ে কালো জুতা। আর ডান পায়ে কালো প্যান্টের অংশ লেগে ছিল। লাশের বুক থেকে তলপেট পর্যন্ত পুরোটাই ছিল ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। বাঁ পায়ের মাংস গোড়ালি পর্যন্ত কাটা।

 

নিহত নারীর উচ্চতা আনুমানিক চার ফুট বলে উল্লেখ করা হয়েছে সুরতহাল প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, তার মুখমণ্ডল ছিল পোড়া, মাথায় সামান্য চুল দেখা গেছে। দুই হাত ও দুই পায়ের গিড়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ দেহ পোড়া এবং বাইরে থেকে কঙ্কাল দৃশ্যমান। একটি পায়ে সামান্য মাংস আছে এবং পায়ের তালুর নিচে আনুমানিক দুই ইঞ্চি কাটা। এসআই সুজন দত্ত লিখেছেন, ‘বুক ও পা দেখে প্রতীয়মান হয় যে লাশটি একজন নারীর।’

 

প্রসঙ্গত, আতিয়া মহলের মালিক উস্তার আলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মর্জিনা বেগম ও কাউছার আলী নামে দুইজন স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে মাস তিনেক আগে ভবনটির নিচতলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আতিয়া মহলের নিচতলায় জঙ্গিরা অবস্থান করছে বলে জানতে পারে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে ওই বাড়ির ভেতর থেকে গ্রেনেড ছোড়া হয়। পরে ঢাকা থেকে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াতকে পাঠানো হয় ঘটনাস্থলে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সন্ধ্যা থেকে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণে নেয় সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো দল। পরদিন তারা ওই ভবনের অন্যান্য বাসিন্দাকে নিরাপদে সরিয়ে আনে। ২৫ মার্চ  শনিবার সন্ধ্যায় অভিযান নিয়ে সেনাবাহিনীর সংবাদ সম্মেলন চলাকালে দুই দফা বিস্ফোরণে দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ছয় জন নিহত হন। আহত হয়েছেন র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানসহ অন্তত ৫০ জন। আর গোটা অভিযানে নিহত হয়েছে ৪ জঙ্গি।