আজ  মঙ্গলবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৮

আনন্দ উচ্ছ্বাসে বর্ষবরণ

parvez_pressclubএম. পারভেজ পাটোয়ারীঃ সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে এবং আলোর পথে এগিয়ে চলার অঙ্গীকারের মধ্যদিয়ে জাতি বরণ করলো নতুন বছরকে। ১৪২৪ বঙ্গাব্দের নতুন সকালে উগ্র মৌলবাদী ভীতি উপেক্ষা করে সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে রুখতে সর্বজনীন চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে বাঙালি জাতি মেতে উঠেছিল উত্সবে। ছায়ানটের রমনা বটমূলে বর্ষবরণের পঞ্চাশ বছরে পদার্পণ আর মঙ্গল শোভাযাত্রার ইউনেস্কোর অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি এবারের বর্ষবরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

 

শুক্রবার সকালে পহেলা বৈশাখে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে। লাখো মানুষের বর্ণিল, উচ্ছল পদচারণায় রাজধানী  জনসমুদ্রে পরিণত হয়। চির নতুনের ডাক দিয়ে আসা পহেলা বৈশাখের বৈচিত্র্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে নারী-পুরুষের রঙিন সাজে, শিশুদের মুখে ফুটে ওঠা আনন্দের হাসি আর বর্ণিল পোশাকে।

 

এবার বেশিসংখ্যক নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হয়ে পার্কে ঢুকতে হয়েছে সকলকে। পুলিশের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যারা ব্যাগ, এমনকি ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে বর্ষবরণের উত্সবে এসেছিলেন, তারা এবার মূল উত্সবে ঢুকতে পারেননি।

 

ছায়ানটের বর্ষবরণ :প্রতিবারের মতো এবারও রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণের মূল আয়োজন। বটমূলে ছায়ানটের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবার তিন পর্বে বিভক্ত ছিল অনুষ্ঠান। এবারে এ আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘আনন্দ, আত্মপরিচয়ের সন্ধান ও মানবতা’। ১৯৬৭ থেকে ছায়ানট রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করে আসছে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই সকাল ৬টা ১০ মিনিটে অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বের সূচনায় ভৈরবী রাগে রাজরূপা চৌধুরীর রাগালাপ এবং রবীন্দ্র-নজরুলের প্রভাত সঙ্গীতের সুরের আবেশ ছড়িয়ে পড়ে রমনায়। ভোর সাড়ে ছয়টায় ছায়ানটের ৫০ বছর আগেকার প্রথম অনুষ্ঠানের সম্মেলক গান— ‘আলোকের এই ঝরনাধারায় ধুইয়ে দাও…’ এর সুরে দ্বিতীয় পর্বের শুরু হয়। এ পর্বে ১০টি সম্মেলক ও ১৩টি একক গান এবং ৪টি পাঠাবৃত্তি পরিবেশিত হয়। ছোট ও বড়দের দল মিলিয়ে সম্মেলক গানে অংশ নেয় ১১১ জন শিল্পী। ছায়ানটের অনুষ্ঠানের ঐতিহ্য অনুসারে জাতীয় সংগীতের আগে শুভেচ্ছা কথন নিয়ে আসেন সভাপতি সন্জীদা খাতুন। তার কথনের পরে জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে শেষ হয় দ্বিতীয় পর্ব। তৃতীয় ও শেষ পর্বে পরিবেশিত হয় দেওয়ানা মদিনা লোকপালা।

 

চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা :নববর্ষে মঙ্গলবার্তা নিয়ে শুক্রবার সকাল নয়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঐক্য ও অসামপ্রদায়িকতার আহবানে এবং ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর’— এ প্রতিপাদ্যে মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় লোকজ মোটিফের হরেক রঙের মুখোশ, হাতি, বাঘ, ফুল, পাখির প্রতিকৃতি স্থান পায়। সবার সামনে ছিল সমৃদ্ধির প্রতীক কালো হাতি। আরো ছিল সূর্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে চারুকলা অনুষদ থেকে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। এতে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও চারুকলার ডিন মোঃ নিসার হোসেনসহ শিক্ষকবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।

 

মঙ্গল শোভাযাত্রাটি চারুকলা থেকে বের হয়ে হোটেল রূপসী বাংলা মোড় ও টিএসসি হয়ে আবার চারুকলায় গিয়ে শেষ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগের উদ্যোগে কলাভবন বটতলায় সকাল ৮টায় সংগীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।

 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল শোভাযাত্রা :জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ‘মাছে ভাতে বাঙালি’- এ স্লোগানকে সামনে রেখে মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ ১৪২৪ কে বরণ করে নিয়েছে। এবারের শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘জাতীয় মাছ ইলিশ’। শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে শোভাযাত্রাটি বের হয়। এটি পুরনো ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক, রায়সাহেব বাজারসহ বিভিন্ন মোড় ও সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় ক্যাম্পাসে গিয়ে শেষ হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সামাজিক বিজ্ঞান ভবন প্রাঙ্গণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠান চলে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। এ ছাড়া পুরনো ঢাকার ‘পোগোজ ল্যাবরেটরী স্কুল এন্ড কলেজে’ দিনব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। শোভাযাত্রাটির নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান।

 

সুরের ধারা ও চ্যানেল আই :বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে ষষ্ঠবারের মতো চ্যানেল-আই ও সুরের ধারা চৈত্র সংক্রান্তি ও বর্ষবরণের আয়োজন করে। বর্ষ বিদায়ের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে। চৈত্র সংক্রান্তি অনুষ্ঠান শেষ হয় রাত ১২টায় এবং হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শুরু হয় শুক্রবার সূর্যোদয়ের সাথে সাথে। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিবেশিত হয় বর্ষবরণের এ আয়োজন।

 

বাংলা একাডেমি :বাংলা একাডেমি চত্বরে অনুষ্ঠান শুরু হয় শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টায় একাডেমির রবীন্দ্র-চত্বরে। বর্ষবরণ উপলক্ষে একক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে একাডেমি ‘বইয়ের আড়ং’ শিরোনামে শুক্রবার থেকে ১০ বৈশাখ পর্যন্ত বইমেলার আয়োজন করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ কুটির শিল্প কর্পোরেশন এবং বাংলা একাডেমি যৌথভাবে ১০ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে। বিকালে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি বৈশাখী মেলার উদ্বোধন করেন।

 

শিশু একাডেমি :সাংস্কৃতির নানা আয়োজনে রঙে-বর্ণে, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মুখরিত ছিল পহেলা বৈশাখে। সকালে একাডেমির প্রশিক্ষণার্থীরা সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করে। সকালে ‘বৈশাখে রং লাগাও প্রাণে’ শিরোনামে ক্যানভাসে ছবি এঁকে উদ্বোধন করেন মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পরিচালক আনজীর লিটন। উদ্বোধনের পর ছিল বাউলশিল্পী কুদ্দুস বয়াতী, শ্রীপুর, মাগুরার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিল্পী নয়ন সরকার এবং শিশু একাডেমির প্রশিক্ষণার্থীদের কণ্ঠে সঙ্গীত।

 

কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা :কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলায় প্রতিবছরের মতো  এবারেও আনন্দানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পহেলা বৈশাখের সকালে কচি-কাঁচা প্রাঙ্গণে এবং মিলনায়তনে কচি-কাঁচার মেলার শিশু-কিশোর, তরুণ-প্রবীণ সদস্যদের অংশগ্রহণে আলোচনাচক্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুরস্কার বিতরণ ও পিঠামেলা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মেলার সহ-সভাপতি ড. রওশন আরা ফিরোজ ও সম্পাদক আলপনা চৌধুরী, শিশুবক্তা ছড়া, আদিব ও নুসাইবা। সভাপতিত্ব করেন মেলার সভাপতি খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।

 

জাতীয় প্রেস ক্লাব ও ডিআরইউ :জমজমাট অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাব বাংলা নববর্ষকে বরণ করেছে। প্রেসক্লাব বর্ষবরণে তাদের সদস্য ও পরিবারবর্গের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বর্ষবরণের শুভেচ্ছা বিনিময়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে আসেন। প্রেসক্লাব সভাপতি শফিকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়ামিন, সাংবাদিক গোলাম সারোয়ারসহ সিনিয়র সাংবাদিকবৃন্দ তাকে স্বাগত জানান। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি তাদের সদস্য ও পরিবারের সদস্যদের জন্য দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিশেষ আকর্ষণ ছিল টাঙ্গাইলের ‘সঙযাত্রা’।

 

এছাড়া রমনার পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও টিএসসিসহ পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্থানেও হয় নানা অনুষ্ঠান। ঢাকেশ্বরী মন্দির শুক্রবার থেকে মন্দির প্রাঙ্গণে বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে।