আজ  মঙ্গলবার, ১৯ জুন, ২০১৮

করনেট গ্রাফিক্সের আয়োজনে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণ

@ Final-11

সুনামগঞ্জ (তাহেরপুর) থেকে ফিরে এম. পারভেজ পাটোয়ারীঃ

দেশের উত্তর-পূর্ব দিগন্তের সীমান্ত ঘেরা হাওরের রাজধানী হিসাবে পরিচিত সুনামগঞ্জ জেলা। শুধু হাওরেই নয়, জীববৈচিত্র্য সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হাওর, নদী, পাহাড়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর শিল্পের কারুকার্যে ভরপুর করে দিয়েছেন বিধাতা।  জেলার ১১টি উপজেলা জামালগঞ্জের পাকনার হাওর, হালির হাওর, জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওর, বিশ্বম্ভরপুর, ধর্মপাশা, দিরাই, শাল্লা ও তাহিরপুরের টাংগুয়ার হাওর, শনির হাওর, মাটিয়ান হাওরসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ৪ শতাধিক (২০ একরের ঊর্ধ্বে) হাওর রয়েছে। এসব হাওরের রূপবৈচিত্র্য দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার সৌন্দর্যপিপাসু দর্শনার্থীর আগমনে মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে হাওরগুলোতে। পর্যটকরা টাংগুয়ার হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে এসে নীল জররাশির মাঝে নৌকায় বসে, কেউবা হাওরের পানিতে সাঁতার কেটে গোসল করে, কেউবা হাওরের শীতল হাওয়া ও পূর্ণিমার আলোয় রাতযাপন।  কিন্তু সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটক ও দর্শনার্থীরা সুনামগঞ্জের সীমান্ত নদী, পাহাড়, পাহাড়ি ঝর্না, হাওর, বাঁওড়ের হিজর, করচ, নলখাগড়া বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নানা প্রজাতির বনজ, জলজ প্রাণি আর হাওর পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন। বিশেষ করে তাহিরপুর উপজেলার আন্তর্জাতিক রামসার সাইট খ্যাত জীববৈচিত্র্য, সম্পদ ও সৌন্দর্যে ভরপুর টাংগুয়ার হাওরের অনন্য বৈশিষ্ট্য থাকায় দেশ-বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বর্ষায় হাওরে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া হিজল, করচের ডালগুলো বর্ষার অথৈই জলে ডানাকাটা পরীর মতো ভাসমান আর শুষ্ক মৌসুমে পাতাবিহীন ডালপালাগুলো ভাস্কর্যে রূপ নেয়। আর শীত মৌসুমে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পাখির মিলনমেলা ও সবুজের সমারোহ চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যে মনপ্রাণ খুলে উপভোগ করছেন বেড়াতে আসা সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটক ও দর্শনার্থীরা। ফলে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এখন একা না এসে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে আসছেন হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। জেলার টাংগুয়ার হাওর, বারেকটিলা, যাদুকাটা নদী, হাওলি জমিদারবাড়ি, সীমান্তের আদিবাসী পল্লী, মেঘালয় পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে আসা ছোট বড় ২০টি ঝরনাসহ ৪৬টি দর্শনীয় স্থান রয়েছে।

@ Final-8

হাওর পাড়ের মানুষের নিরব কান্না”
স¤প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমন করে স্ব-চক্ষে দেখে এসেছি হাওর পাড়ের মানুষের জীবনচিত্র। সমস্যা সম্ভাবনার অন্তরালে চলছে স্থানীয় বসবাসকারী মানুষের জীবন । দেশ এগিয়ে যাচ্ছে,ডিজিটাল হচ্ছে মানুষের জীবনচিত্র । আশার দিক হলো তাহিরপুর অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগের অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে । এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা । কিন্তু পরিবর্তন হয়নি হাওর পাড়ের মানুষের জীবনমান ।
পানির সাথে বসবাস,পানির সাথে সংগ্রাম আর পানিই যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই মানুষগুলির। আজও অবহেলিত,বঞ্চিত, দুঃখ দূর্দশাগ্রস্থ মানুষের নিরব কান্না যেন হাওরের ঢেউয়ের মত উতাল। বিশেষ করে নিরাপদ টয়লেটের ব্যবস্থা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য।
শিল্প সংস্কৃতি,পর্যটন সব দিক থেকে সম্ভাবনাময় হলেও মানুষের জীবন মান উন্নযনে আজও নেই কোন ভৃমিকা । হাওর পাড়ের মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস ফসল । আগাম বন্যা ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে ঠেলে দিয়েছে । নিঃস্ব নিস্ফল অসহায় মানুষগুেিল ঘরে ঠিক মত খাবার জুটানোর কঠিন হয়ে পড়ে । এই এলাকার মানুষের জীবিকা নির্বাহের আরেক মাধ্যম মৎস আহরন ।
এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেল, সম্ভাবনার হাতছানি থাকার পরও অগ্রযাত্রার পথে প্রধান অন্তরায় । তারা জানালেন, স্থানীয় সম্পদশালী বা উদ্যোক্তা পর্যায়ের মানুষ প্রায় সবাই সুনামগঞ্জ বা সিলেট শহরে বসবাস করেন । প্রচুর সম্ভাবনা,নদী পথ আর সড়ক পথের অপূর্ব সমন্বয় এরপর অতি কম পারিশ্রমিকে শ্রমীক থাকার পরও গড়ে উঠছেনা কোন শিল্প কারখানা । নেই সরকারী বেসরকারী উদ্যোগ । হাওর পাড়ের মানুষগুলি যে তিমিরে ছিলেন আজও সে তিমিরেই রয়ে গেছেন । তাদের হাহাকার আর নিরব কান্না হাওরের ঢেউয়ের মত বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে । কিন্তু শোনার যে কেউ নেই ।
গত ২ মার্চ বৃহস্পতিবার রাত ১০.৪৫ মিনিটে ঢাকার আরামবাগ শ্যামলী পরিবহন কাউন্টার থেকে রওনা দিয়েছি। যাত্রা বিরতিতে ১.২০ মিনিটে আশুগঞ্জের উজানবাটি রেস্টুরেন্টে আমরা রাতের খাবার সেরে নেই। ৩০ মিনিট বিরতির পর বাস ছুটে সুনামগঞ্জ সদরের বাসষ্ট্যান্ডে। সেখান থেকে টমটমে আমরা ১১ জন আড়াই ঘন্টা ভ্রমণের পর তাহেরপুর বাজারের হাওরপাড়ের মানুষের কাছাকাছি পৌছলাম সকাল ১০টায়। তাহেরপুর বাজারে অবস্থিত তাহেরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম ও ট্রলার চালক সেলিম ভাই অভ্যর্থনা দেন। তারপর তাহেরপুর বাজারে অবস্থিত টাঙ্গুয়ার রেস্টুরেন্টে আমরা সকালের নাস্তা সেরে নেই । বাজার থেকে টমটমে করে সোলায়মানপুর বাজার থেকে ট্রলার ভাড়া করে সারা দিনের জন্য আমরা পৌছে যাই হাওরে ।

 

8
সেখানে আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করেন স্থানীয় ট্রলার চালক সেলিম ভাই। আমাদের ভ্রমনের তত্বাবধায়ক ছিলেন করনেট গ্রাফ্রিক্সের ভবিষ্যৎ কর্ণধার আশীষ ভাই, মতিউর রহমান, শাহাদাত, ফারুক, গোলাম মোস্তফা দীপু, খলিল, দেলোয়ার, আজিম উদ্দিন, আবুল হাসান, আল আমিন, ফারুক, এম. পারভেজ পাটোয়ারী।
সারাদিন টাঙ্গুয়ায় ঘুরে বেড়ানো, উচু ওয়াচ টাওয়ার থেকে হাওর দেখা, হাওর থেকে টাটকা বোয়াল মাছ, বড় বাইং মাছ ক্রয় করা, সবাই মিলে সাতার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা, ফুটবল খেলা, আর ফটো সেশন। তারপর দুপুর ২টায় যথারীতি বোয়াল মাছ লাউ দিয়ে রান্না, অসাধারণ ডাল সবাই মিলে হাওরে ভাসমান ট্রলার উপরে বসে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম।
দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ ক্লান্তি কাটিয়ে আবারও ট্রলার ছুটে চললো হাওরের নয়নাভিরাম  সৌন্দর্য্য দেখার জন্য। তারপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো। রাতে আমাদের ট্রলারই রাত যাপন করতে হবে। তাই সুন্দর একটি জায়গা দেখে আমরা ট্রলার নৌঙ্গর করলাম।  খুব কাছেই আমরা একটি বাজার দেখতে পেলাম। সারাদিন হাওরের মাঝে নৌ ভ্রমন ও ট্যাকেরঘাট থেকে শেষে সন্ধ্যায় শ্রীপুর বাজারে নাস্তা খাওয়ার জন্য রেষ্টুরেন্টে খোজতে গিয়ে মানসম্পন্ন কোন রেষ্টুরেন্ট না পেয়ে আমরা যখন হতাশ হলাম । সেখানে গিয়ে সবাই মিলে চা, মচমচা ভাজা পুরি, আলুর চপ, বেগুনি, সোলা, ইত্যাদি খেয়ে আমরা বাজার ঘুরে দেখলাম স্থানীয় সরল সোজা মানুষদের হাওরের সংগ্রামী জীবন যাপনের অনুভূতির বর্হিপ্রকাশ।  চালক সেলিম ভাই বলেন, দুঃখের বিষয় হলো এই এলাকায় স¤প্রতি চুরি,ডাকাতির প্রবনতা বৃদ্ধি পেয়েছে । ফসল নেই,মাছ ধরা বন্ধ, ব্যাবসা করার পুজিও নেই, আর ট্যাকেরঘাট কয়লা খনি চলে গেছে সিন্ডকেটের হাতে । হাওরের অদূরে দ্বীপ এলাকার মত ভেসে উঠা ছোট ছোট চরে কয়েকটি ঘরবাড়ি নিয়ে রয়েছে একেকটি মহল্লা । নেই শিক্ষা গ্রহনের কোন সুযোগ । প্রতিটি চরের সাথে একেকটি ট্রলারে ভাসমান স্কুল তৈরী করেছে ব্্র্যাক । নাম দিয়েছে ” ব্র্যাক শিক্ষা তরী” । বিভিন্ন এনজিও সংস্থা ঐ এলাকার অবহেলিত মানুষের উন্নয়নে কাজ করছে । তারপর বাজার থেকে আমরা আবারো যথাসময়ে ট্রলারে আসলাম।
রাত ১০টায় আমরা রাতের খাবার সেরে বসে পড়লাম রাতে হাওরের জ্যোৎস্না, গান গাওয়া, বিভিন্ন গল্প করা আনন্দে মাস্তিতেই কেটে যায় রাত। সকালে উঠে সবাই ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা ভুনা খিচুরী খেয়ে যার যার মত প্রস্তুতি নিলাম ঢাকা আসার জন্য।

@ Final-14

ঐতিহাসিক শিমুল ফুলের বাগান
১০০ বিঘার বেশি জায়ঘা জুড়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে জাদুকাটা নদীর তীওে এই শিমুল ফুলের বাগান। পাশাপাশি আছে লেবু গাছ। বসন্তের দুপুরে পাপড়ি মেলে থাকা শিমুলের রক্তিম আভা মন রাঙায় বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা পর্যটকদের। এ যেনো রঙে সাজানো এক শিমুলের প্রান্তর। ওপারে ভারতের মেঘালয় পাহাড়, মাঝে যাদুকাটা নদী আর এপারে শিমুল বন। সব মিলে মিশে গড়ে তুলেছে প্রকৃতির এক অনবদ্য কাব্য। সেখানেও আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে শিমুল ফুলের ছোয়া নিয়ে রওনা হলাম ঐতিহাসিক ট্র্যাকের ঘাট নীলাদ্রীতে।

 

@ Final-7
ঐতিহাসিক ট্যাকেরঘাট নীলাদ্রী ভ্রমন ।
মেঘালয়ের পাদদেশে রয়েছে লেক ও লাল মাটির রাস্তা । আর পাশেই সবুজ ঘাস সমৃদ্ধ উচু নিচু টিলা সদৃশ্য । দেখলে মনে হয় যেন কেই ঘাসের কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে । একদিকে পাহাড় অপরদিকে হাওর, মাঝখানে লেক আর রাস্তা যেম এক সবুজের সমারোহ । যাকে পর্যটকরা নাম দিয়েছেন ”নিলাদ্রী”।

@ Final-5
অবশেষে হাওর পাড়ের মানুষের বার্তা নিয়ে আমরা পৌছলাম নিজ নিজ গন্তব্যে । হাসি ফুটুক হাওর পাড়ের অসহায় পিছিয়ে পড়া জনপদের মানুষের মাঝে । আপনিও ঘুরে আসুন টাঙ্গুয়া হাওরে।