আজ  শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৭

গ্যাস সংকটে শিল্প দুর্ভোগ বাড়িতেও

47990-gas_amar

স্টাফ রিপোর্টার : প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম পাওয়ায় রাজধানীসহ সারা দেশে গ্যাসের সংকট চলছে। বাড়িতে চুলা জ্বলছে টিম টিম করে। সকাল ৮টার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকার বেশিরভাগ আবাসিক এলাকায় গ্যাসের চাপ থাকে না। গ্যাস সংকটে গাজীপুরের শফিপুর, কোনাবাড়ীসহ আশপাশের এলাকার অধিকাংশ শিল্পকারখানা দিনে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আস্তে আস্তে এ সংকট সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এক মাস ধরে গাজীপুর ও আশপাশে গ্যাস সংকটের কারণে স্থানীয় জনগণ তিতাস অফিস ঘেরাও, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। এরপরও কর্তৃপক্ষ নির্বিকার।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ২-৩ দিনের মধ্যে গ্যাসের এ সংকট সামাল দেয়া সম্ভব হবে। এজন্য কাজ চলছে। প্রয়োজনে গ্যাসনির্ভর কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সার কারখানা বন্ধ রেখে শিল্পাঞ্চলগুলোয় গ্যাস সরবরাহ করা হবে। জানা গেছে, শনিবার থেকে রাজধানীর বেশ কিছু আবাসিক এলাকায় নতুন করে গ্যাস সংকট বেড়েছে। রবি ও সোমবার সারা দিন পূর্ব ঢাকার বেশিরভাগ বাড়িতে গ্যাস ছিল না। ফলে সকালের নাশতা ও দুপুরের খাবার হোটেল থেকে কিনে খেতে হয়েছে এসব এলাকার বাসিন্দাদের। এতে হোটেলের ওপর চাপ পড়েছে। হোটেল মালিকদের অনেকেই বাইরে অস্থায়ী চুলায় রান্না করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন।

তিতাস কর্তৃপক্ষ বলছে, গাজীপুর শফিপুর, কোনাবাড়ীসহ আশপাশের এলাকার অধিকাংশ শিল্পকারখানায় গ্যাসের যে সংকট চলছে, তা শিগগিরই সামাল দেয়া কঠিন হবে। তবে রাজধানীতে যে সংকট, তা আজকের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মসিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে সারা দেশে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সংকট চলছে। বেশিরভাগ গ্যাস ক্ষেত্রগুলোয় উৎপাদন কমে গেছে। তিতাস গ্যাস কোম্পানি আগে যেখানে ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেত, সেখানে এখন তিতাসকে দেয়া হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের গ্যাস সংকট সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, রাজধানীর পূর্ব অংশে রবি ও সোমবার যে গ্যাস সংকট ছিল, তা সমাধান হয়ে গেছে। সিটি কর্পোরেশনের সংস্কার কাজের সময় ১৫ ইঞ্চির একটি গ্যাসলাইন ফেটে গিয়েছিল। ফলে রবি ও সোমবার দু’দিন রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে গ্যাস সংকট ছিল। তবে এরই মধ্যে ওই পাইপলাইন মেরামত হয়ে গেছে। তিনি আশা করছেন, এ এলাকার সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে ৩৩০ মেগাওয়াটের একটি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করতে গিয়ে সারা দেশে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। সোমবার পেট্রোবাংলার ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য গ্যাসের চাহিদা ছিল ৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু সোমবার সরবরাহ করা হয়েছে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এছাড়া খুলনার গ্রিডলাইনেও নতুন করে গড়ে ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এ কারণে সারা দেশে গ্যাস সংকট ছড়িয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শুধু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রতিদিন গড়ে ১০১ কোটি ঘনফুট গ্যাস লাগে। আর সারকারখানায় লাগে ৩১ কোটি ঘনফুট গ্যাস।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, সিলেট গ্যাসফিল্ড, তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রসহ ১০টি বড় গ্যাসকূপ থেকে কয়েকদিন ধরে গ্যাস উৎপাদন কমে গেছে। এর মধ্যে ভাঙ্গুরা গ্যাসফিল্ডে আগে উৎপাদন হতো ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস (এমএমসিএফ), সেখানে সোমবার উৎপাদন হয়েছে ৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট। এছাড়া রূপগঞ্জ গ্যাসফিল্ডে ৮ এমএমসিএফডি থেকে কমে উৎপাদন হচ্ছে দশমিক ৪ মিলিয়ন ঘনফুট। সেমুতাং গ্যাসফিল্ডে আগে হতো ৩ এমএমসিএফডি, এখন হচ্ছে দশমিক ৯ এমএমসিএফডি। শাহবাজপুরে আগে হতো ৫০ এমএমসিএফডি, এখন হচ্ছে ৩৭.২ এমএমসিএফডি, ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাসফিল্ডে আগে ২৬ এমএমসিএফডি হতো, এখন হচ্ছে ১২.০১ এমএমসিএফডি। সালদায় আগে ছিল ১০, এখন ৩.০৮ এমএমসিএফডি, রিয়ানীগঞ্জ গ্যাসফিল্ডে আগে হতো ১৫, এখন ৯.২ এমএমসিএফডি। সিলেট গ্যাস ফিল্ডে আগে হতো ৮ এমএমসিএফডি, এখন হচ্ছে ৫ এমএমসিএফডি। তিতাস গ্যাসফিল্ডে আগে হতো ৫৪২ এমএমসিএফডি, এখন হচ্ছে ৩৩৫ এমএমসিএফডি।

সোমবার গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকার শিল্পমালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার পণ্য উৎপাদনে চরম বিঘœ ঘটছে। শিল্পমালিকরা বলছেন, এভাবে লাভ তো দূরের কথা, রফতানিমুখী বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান লোকসানের দিকে যাচ্ছে। স্থানীয় শিল্পমালিকদের অভিযোগ, কিছুদিন পরপর শিল্পাঞ্চল হিসেবে খ্যাত এ এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে। ১৫ পিএসআই চাপ নেমে এখন দাঁড়িয়েছে ১ পিএসআইয়ে। কিন্তু বিল গুনতে হচ্ছে ১৫ পিএসআই চাপের। এ নিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর উদ্বেগ, চিঠি চালাচালি হলেও নির্বিকার সরকার। সংকট নিরসনে সোমবার পেট্রোবাংলায় জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু কিছুতেই সমাধান মিলছে না।

ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীদের অনেকে যুগান্তরকে বলেন, গ্যাস না পেয়ে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেলের ব্যবহার বাড়ায় কারখানাগুলোয় পণ্যের উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষত, রফতানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোয় এ সংকট চরম আকার ধারনের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন শিল্পকারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশ কিছু দিন ধরে গাজীপুর এলাকায় গ্যাস সংকট চলছে। এতে কারখানার উৎপাদন ব্যাহতের পাশাপাশি খরচও বাড়ছে অনেক। প্রয়োজনীয় গ্যাস না থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় জেনারেটর ও বয়লারের মতো যন্ত্রপাতির জন্য বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে গ্যাসের তুলনায় খরচ পড়ে দ্বিগুণ। ভারি শিল্পকারখানাগুলোও একইভাবে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে।

কোনাবাড়ী, সফিপুর ও সিনাবোহ এলাকার কয়েকটি কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এক মাস ধরে এ গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। সন্ধ্যার পর সীমিত আকারে কিছু কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ পাওয়া গেলেও সারা দিন থাকে শূন্য। ফলে কোনো কোনো কারখানার একটি ইউনিট কোনোমতে চালানো সম্ভব হলেও গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় পুরোপুরি উৎপাদনে যাওয়া যাচ্ছে না।

এ পরিস্থিতিতে শুধু শিল্পকারখানা নয়, এলাকার সিএনজি স্টেশন ও বাড়িতেও গ্যাসের সমস্যা হচ্ছে। সিএনজি স্টেশনে কয়েকদিন ধরে দীর্ঘ লাইন হয়ে যাচ্ছে। সেখানেও গ্যাসের চাপ নেই। বহু এলাকা থেকে খবর আসছে, তাদের চুলাও জ্বলছে না। গাজীপুরের কোনাবাড়ী বিসিক শিল্প এলাকার নাইটিঙ্গেল গ্রুপের কারখানা ব্যবস্থাপক টিএম হুমায়ূন কবির জুয়েল জানান, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত গ্যাসের প্রেসার একেবারেই কমে যায়। এ সময় যে প্রেসার থাকে, তা দিয়ে কোনো মেশিন চালানো সম্ভব নয়। তখন ডিজেল মেশিন ব্যবহার করতে হয় বিকল্প হিসেবে।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়ও গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। দিনের অধিকাংশ সময়ই গ্যাসের দেখা মিলছে না অনেক এলাকায়। গ্যাসের সংকট রয়েছে সেগুনবাগিচা, জাতীয় প্রেস ক্লাব, উত্তর শ্যামলী, মোহাম্মদপুর শেখেরটেক, পশ্চিম আগারগাঁও, পীরেরবাগ, পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার, সিক্কাটুলী, মাজেদ সরদার রোড, কসাইটুলী, রামপুরা, শঙ্কর, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, ধানমণ্ডি, মধুবাজার, ঝিগাতলা, দক্ষিণ গোড়ান, রূপনগর, শেওড়াপাড়া, সেনপাড়া পর্বতা, উত্তর ইব্রাহিমপুর, মাদারটেক, কল্যাণপুর, উত্তরখানসহ বিভিন্ন এলাকায়।