আজ  শুক্রবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৮

জনপ্রিয়তার লড়াইয়ে এগিয়ে কোন দল?

fff

এ বছরের শেষ দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই নির্বাচনকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে নানামুখি জল্পনা-কল্পনা এবং হিসাব-নিকাশ। রাজনৈতিক দলগুলো ঘর গোছানোর চেষ্টা করছে। ছোট দলগুলো বড়ো দলের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে সংসদে যাওয়ার কৌশল খুঁজছে। জোট-মহাজোটের রাজনীতিতেও নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বে ২০- দলীয় জোট থাকবে, না ভাঙবে সে আলোচনা যেমন আছে, তেমনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের কলেবর বাড়া বা কমার বিষয়েও আলোচনা আছে। নামসর্বস্ব দলগুলো নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য ঘুর ঘুর করছে, সিকে ছেড়ার উপায় খুঁজছে। আশা করা যায় রোজা এবং ঈদের ব্যস্ততা শেষ হলে দেশে নির্বাচনী রাজনীতির পালে হাওয়া লাগবে।

আমাদের দেশে নির্বাচনী রাজনীতি আসলে সীমাবদ্ধ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি – এই দুই দলের মধ্যে। হয় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে নতুবা বিএনপি। এরশাদ-পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এই ধারাই চলছিল। টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড আওয়ামী লীগ তৈরি করলো ২০১৪ সালে, সেটাও অনেকটা একতরফা নির্বাচনে। বিএনপি ওই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। নিয়মরক্ষার নির্বাচনে ক্ষমতায় বসে সরকার মেয়াদ পূরণ করতে পারবে কিনা সেটা নিয়ে অনেকের মনেই সংশয় ছিল। ধারণা করা হচ্ছিল তথাকথিত গণতান্ত্রিক দুনিয়া এটা ভালো ভাবে নেবে না, সরকারের ওপর নানা ধরনের চাপ থাকবে। তাই তাদের পক্ষে মেয়াদ পূর্ণ করা সম্ভব হবে না। যেসব রাজনৈতিক পণ্ডিতরা সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন তারা এখন সরকারের মেয়াদ শেষে এসে বলছেন, আগের বার যেটা সম্ভব হয়েছে, এবার সেটা হবে না। আগামী নির্বাচন যদি অংশগ্রহণমূলক না হয় তাহলে দেশ বড়ো ধরনের সংকটের মধ্যে পড়বে। গণতান্ত্রিক বিশ্ব বিষয়টি ভালোভাবে নেবে না।
ব্যক্তিগতভাবে আমার অবশ্য এটা মনে হয় না যে, আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে দেশে মারাত্মক কোনো সংকট তৈরি হবে। নির্বাচন অবশ্যই বিতর্কমুক্ত হওয়া ভালো। সুষ্ঠু নির্বাচন আমরা সবাই চাই। আবার আমরা এটাও চাই যে, আমার পছন্দের দলটি যেন নির্বাচনে জেতে । আমরা কেউ নিজেদের পরাজিতের দলে দেখতে চাই না।  অথচ জয়-পরাজয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রীতি।
তাছাড়া আমাদের দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের অবস্থান এতোটাই বিপরীতমুখি যে এখানে একমত হওয়ার রাজনীতি আদৌ সম্ভব হবে কি না বলা মুশকিল। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির জনসমর্থন বা জনপ্রিয়তা যতোদিন কাছাকাছি থাকবে, ততোদিন অন্তত দেশের রাজনীতিতে সংঘাত-সংঘর্ষের ধারাও অব্যাহত থাকবে। দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে আর একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি গড়ে-বেড়ে উঠলে ভালো হতো। কিন্তু তেমন সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত বাস্তবে দৃশ্যমান নয়।

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেমন জয়লাভের ব্যাপারে আশাবাদী, তেমনি বিএনপিও মনে করে জয় তাদের হাতের মুঠোয়। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন হাইকোর্টের আদেশে তিন মাসের জন্য স্থগিত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকার নিশ্চিত পরাজয় জেনে নিজেদের লোক দিয়ে কারসাজি করে নির্বাচন স্থগিত করেছে। এটি সরকারের অপচেষ্টা। রিট আবেদনকারী আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা। এখান থেকেও বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যায়।
সস্তা এবং মুখরোচক মন্তব্য করা আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। গাজীপুর সিটি নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমও খুশি হতে পারেননি। সরকারই যে পরাজয়ের ভয়ে ওই নির্বাচন স্থগিত করিয়েছে, সেটা বিএনপি মহাসচিব নিশ্চিত হলেন কীভাবে? দেশের আইন-আদালতের প্রতি বিএনপির আস্থা নেই। বিশেষ করে দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শাস্তি এবং জেলে যাওয়ার পর থেকে আদালতবিরোধী মনোভাব বিএনপির মধ্যে আরও প্রবল হয়েছে। একদিকে তারা আদালতের বারান্দায় দৌড়াদৌড়ি করছেন, অন্যদিকে দেশের আদলতকে ক্রমাগত সরকারের আজ্ঞাবহ বলে প্রচার করছেন। এই প্রচারণার পরিণতির কথা বিএনপির নেতারা একবারও ভাবছেন না। দেশের মানুষকে আইনের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল করে করে তোলা কি খুব ভালো ব্যাপার? বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার দল। অর্থাৎ দুদিন আগে হোক আর দুদিন পরে হোক এই দলের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই আজ বিরোধী দলে থেকে এমন কিছু বলা বা করা উচিত নয়, যা তারা ক্ষমতায় গেলে বুমেরাং হয়ে তাদেরই ঘায়েল করতে পারে।

আওয়ামী লীগ টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় আছে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে সরকারবিরোধী মনোভাব আছে। বিএনপি এটাকে পুঁজি করেই রাজনীতিতে বাজি মাত করতে চাচ্ছে। বিএনপি ইতিবাচক ধারায় রাজনীতি করছে না। সর্বত্রই তারা বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা দেখছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমানে বাংলাদেশ যে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, মানবউন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে যে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে যে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অতিক্রম করেছে, সেসব বিএনপি দেখতে চায় না, স্বীকার করতে চায় না। মানুষ বিরোধিতা পছন্দ করে, নেতিবাচক কথাবার্তা মানুষকে বেশি করে আকর্ষণ করে। তবে পরিবর্তনের সুফল যেহেতু মানুষ যতোটুকুই হোক পাচ্ছে, সেজন্য সরকারবিরোধী আন্দোলনেও মানুষ নামছে না।
আমাদের দেশের বড়ো সমস্যা হলো দুর্নীতি ও পুঁজি- লুন্ঠন বা সম্পদ পাচার। আজ যারা প্রচার করছেন তারা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে বিএনপি ক্ষমতায় এলে দুর্নীতি ও পুঁজি-লুন্ঠন প্রক্রিয়া বন্ধ হবে? বিএনপি শাসনের রেকর্ড এতো বছরে হয়তো মানুষের মন থেকে একটু বিবর্ণ হয়েছে। কিন্তু একেবারে কি মুছে গেছে?
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মানুষ সরকারের জুলুম-অবিচারের বিরুদ্ধে ভোট দেবে। ধরে নিলাম কথাটা ঠিক। মানুষ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের হারিয়ে বিএনপির প্রার্থীদের জিতিয়ে দিল। তাহলে কি জুলুম-অবিচার বন্ধ হবে? গত নির্বাচনেও তো কয়েকটি সিটি করপোরেশনে বিএনপির মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাতে কি লাভ হয়েছে? সরকার বদল হয়েছে, নাকি নগরবাসী উন্নয়নবঞ্চিত হয়েছেন?
রাজনৈতিক দলের উচিত সাধারণ মানুষের সামনে এমন বক্তব্য তুলে ধরা যাতে তারা রাজনৈতিকভাবে আরো অধিক সচেতন হয়ে উঠতে পারে। ভুলবার্তা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে ভোটে জেতার রাজনীতি যে একটি দলের প্রকৃত জনপ্রিয়তা বা জনসমর্থনের  প্রমাণ নয় – সেটা আমরা অতীতে একাধিকবার দেখেছি।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনই রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা মাপার উপায়। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সুবিধামতো অবস্থায় এই পরীক্ষায় অংশ নিতে চায়। আর এখানেই বিরোধ, এখানেই বিতর্ক। এই বিরোধ-বিতর্কের আশু অবসান আশা করা যায় না। যারা ক্ষমতায় থাকে এবং যারা ক্ষমতার বাইরে থাকে তাদের স্বার্থ একবিন্দুতে মেলানোর চেষ্টা সহজ নয়।
আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। সবদিক বিবেচনাতেই আওয়ামী লীগই আছে সুবিধাজনক অবস্থানে। আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিও আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে বিএনপি আছে ব্যাকফুটে। দলের প্রধান খালেদা জিয়া জেলে। তিনি জামিনে বের হয়ে আসতে পারলেও শারীরিক কারণেই আগামী নির্বাচনে সারাদেশে ছুটে বেড়িয়ে বিএনপির পক্ষে ভোট সংগ্রহ করতে পারবেন বলে মনে হয় না। বিএনপির দ্বিতীয় প্রধান নেতা তারেক রহমান দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকতে তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা কম।

এই সব বিবেচনায় আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবস্থান নড়বড়ে ভাবার কারণ দেখা যায় না। আওয়ামী লীগের একশ্রেণির নেতা-মন্ত্রী-এমপির দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বাড়াবাড়ি এবং প্রচন্ড দলাদলি হলো আওয়ামী লীগের বড়ো সমস্যা। আবার তার বিপরীতে আছে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আকাশচুম্বী ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। তার সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে মানুষের মধ্যে কোনো সংশয় নেই। আগামী নির্বাচনের আগেই শেখ হাসিনা যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হন তাহলে ভোটের বাক্সে নিঃসন্দেহে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

লেখক : বিভুরঞ্জন সরকার