আজ  শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৭

ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে টাকা ছাড়া সিট মেলে না

1476860952_DSC_1225

এম. পারভেজ পাটোয়ারীঃ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল। সারা দেশের রোগীদের অনেকটা শেষ ভরসাস্থল এ হাসপাতাল। তবে এখানে একেকটি সিট যেন সংঘবদ্ধ চক্রের একেকটি সোনার ডিম পাড়া হাঁস। সিটে রোগী উঠলেই টাকা। টাকা ছাড়া এখানে সিট মেলে না। এমনকি ফ্লোরে রোগী রাখতেও গুনতে হয় টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এ হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় ও এমএলএসএসদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দিনের পর দিন সিট বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের হাতে রোগী ও তাদের স্বজনরা রীতিমতো জিম্মি। তারা ভয়ে এদের বিরুদ্ধে কথা বলেন না। পকেটের বাড়তি টাকা খুইয়ে শুধুই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
হারুনুর রশিদ। তার দুই পা পক্ষাঘাতগ্রস্ত। ৪ জুলাই সন্ধ্যায় স্বজনরা তাকে এ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে যান জরুরি বিভাগের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের কক্ষে। তিনি দেখে তাকে ভর্তি করতে বলেন। এরপর রশিদকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতাল-২ এর ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডে। তবে একজন ওয়ার্ডবয় রোগীর স্বজনকে জানান, সিট নিতে হলে ৮শ’ টাকা লাগবে। না দিতে পারলে ফ্লোরে একটি বিছানা পেতে দেয়া হবে। এর জন্যও গুনতে হবে তিনশ’ টাকা। রোগী রশিদের স্বজন জানান, বাধ্য হয়ে ৩শ’ টাকা দিয়ে বিছানা নেন তারা। এমনকি তাদের শাসিয়েও দেয়া হয়েছে কাউকে এ ব্যাপারে না জানাতে।
২২ জুন আগারগাঁও এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন সুমন (২৫)। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার ভাই আনোয়ার হোসেন। রাত ১০টার দিকে তাকে ভর্তি করা হয় ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানে মনির নামে এক কর্মচারী ৫০০ টাকার বিনিময়ে তাকে ৩৯ নম্বর সিটটি দেন বলে জানান তিনি। আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, টাকা দেয়ার আগে তারা সোজা জানিয়ে দেন, এখানে কোনো সিট খালি নেই। প্রথমে এক হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে ৫০০ টাকায় রাজি হয়। টাকা দেয়ার পর, এখন সিট পাওয়া গেল কিভাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে মনির তাকে জানান, এ হাসপাতালে টাকা দিলে সিট কেন, বাঘের চোখও পাওয়া যায়! আনোয়ার এ প্রতিবেদককে বলেন, আপনাকে জানালাম, তবে আমার রোগী ভর্তি থাকা অবস্থায় লিখবেন না। লিখলে রোগীর ক্ষতি হবে। শুধু হারুনুর রশিদ ও সুমনই নন। তাদের মতো ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রতিদিন এ হাসপাতালে আসা হাজারও রোগী ও তাদের স্বজনরা। টাকা দিয়েও এমন আতঙ্ক কাজ করে তাদের মাঝে।
মঙ্গলবার হাসপাতালের ফুটপাতের ভাতের হোটেলে বসে খাচ্ছেন এক রোগীর স্বজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, এক বছর ধরে তিনি রোগী নিয়ে এ হাসপাতালে আছেন। এখানে টাকা ছাড়া এক পাও নড়া যায় না। পদে পদে ওয়ার্ডবয়, এমএলএসএস ও স্পেশাল বয়দের টাকা দিতে হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এ হাসপাতালে গত সাড়ে তিন বছরে ৫ লাখ ২০ হাজার রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৫৬ জন, ২০১৫ সালে ১ লাখ ৪৯ হাজার ১২২ জন এবং ২০১৬ সালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৪৯ জন রোগী। বাকি রোগী ভর্তি হয়েছেন চলতি বছরে। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, এ হাসপাতালে ১০০ রোগীর মধ্যে ৯০ জনকেই সিট কিংবা বিছানা নিতে হয় টাকা দিয়ে। ৯০ জনের মধ্যে অন্তত ৫০ জন সিট নেন, আর ৪০ জন বিছানা নিয়ে ফ্লোরে শুয়ে চিকিৎসা নেন। অন্যরা নিজেদের বিছানা বিছিয়ে কোনোমতে চিকিৎসা নেন। সিটের জন্য ৫০০ টাকা এবং বিছানার জন্য ৩০০ টাকা হিসেবে যদি ধরা হয়, তাহলে দেখা যায়, সিট বাণিজ্যের নামে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র। অনেক রোগী ও তাদের স্বজনরা  জানান, হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডেই বিছানা বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট। তবে এসব দেখার যেন কেউ নেই। গত সপ্তাহে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, বারান্দায় রোগী, লিফটের সামনে রোগী এবং মেঝেতেও রোগী আছেন। অথচ বিভিন্ন ওয়ার্ডে অনেক সিট খালি পড়ে আছে। অনেকেই জানান, এ হাসপাতালে রোগীর তুলনায় সিটের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। তবে হাসপাতালের পিওন, সুইপারসহ ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের হাতে বাড়তি অর্থ দিলেই মেলে সিট। আর এ অনিয়মের কারণে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
ঢাকা মেডিকেলের নতুন ভবন-২ এর সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই চোখে পড়ে বিভিন্ন বয়সী রোগীর ভিড়। নির্ধারিত ওয়ার্ডে সিট না পেয়ে অনেক রোগী বারান্দায় শুয়ে আছেন। পাশেই বসে আছেন রোগীর স্বজনরা। দ্বিতীয় থেকে নবম তলার একই চিত্র। সিট না পেয়ে ফ্লোরে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। একাধিক রোগীর স্বজন জানান, তাদের বলা হয়েছে, ওয়ার্ডে সিট ফাঁকা নেই। ফাঁকা হলেই সিট দেয়া হবে। তবে ফাঁকা হলে সিট পাওয়ার নজির এখানে খুব কমই আছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
হাসপাতালের ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজন জানান, তার রোগী চার দিন ধরে ফ্লোরে পড়েছিল। এক এমএলএসএসকে ৮শ’ টাকা দেয়ার পর তিনি সিট পেয়েছেন। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য চেষ্টা করেও ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম  বলেন, এ বিষয়ে কথা বলার তার কোনো এখতিয়ার নেই। যা বলবেন পরিচালক। তবে তিনি জানান, রোগীর তুলনায় এ হাসপাতালে সিট সংখ্যা সীমিত। এ কারণে সবাইকে সিট দেয়া সম্ভব হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই বারান্দায় চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। সিট ফাঁকা থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলো বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত। কোনো বিভাগে স্বল্প রোগী ভর্তি হন। ফলে সিট ফাঁকা থাকে। এক বিভাগের রোগীকে অন্য বিভাগে রাখা যায় না বলেই কিছু সিট ফাঁকা থেকে যায়। তবে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবাইকে সমান সুযোগ হাসপাতালের পক্ষ থেকে দেয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।