আজ  মঙ্গলবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৮

নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ সম্পর্ক শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে দ্বন্দ্ব কাম্য নয় :প্রধানমন্ত্রী

01আইএনএন২৪বিডি.কম :  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের দূরত্ব ঘোচাতে আলোচনাকেই সমাধানের রাস্তা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, ‘আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যে কেনো ভুল বোঝাবুঝির সমাধান হওয়া উচিত। রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অর্গান আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সুষম সমন্বয়, সম্পর্ক ও সমঝোতা থাকা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের এই তিন অঙ্গ একে অপরের সম্পূরক হিসাবেই কাজ করবে। একে অপরকে অতিক্রম করবে না বা এখানে ক্ষমতা দেখানো ঠিক নয়। ক্ষমতা কারো হাতে কিন্তু কম নয়। এখন কে কাকে সম্মান করবে, কে কাকে করবে না, কে কার সিদ্ধান্ত মানবে আর কারটা নাকচ করবে, এই দ্বন্দ্বে যদি আমরা যাই, তাহলে কিন্তু একটি রাষ্ট্র সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে না। যখন এ তিনটি অঙ্গের মধ্যে একটি সুসর্ম্পক বা সমঝোতা থাকবে তখনই একটি রাষ্ট্র সঠিকভাবে চলতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে  কোনো দ্বন্দ্ব কাম্য নয়।

 

গতকাল শনিবার রাজধানীর কাকরাইলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের জন্য নবনির্মিত ২০ তলা আবাসিক ভবন উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষমতা নিয়ে তিন অঙ্গের মধ্যে দ্বন্দ্ব অপ্রত্যাশিত। রাষ্ট্রকে সুষ্ঠুভাবে চালাতে গেলে এই তিনটি অঙ্গকে যথাযথভাবে কর্মপরিকল্পনা মতো চালাতে হবে। সেই সঙ্গে আমি বলব, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্টদের কিছু কিছু ক্ষমতা থাকে। সেই ক্ষমতা আমরা কতটুকু প্রয়োগ করতে পারি, সেটা কতটা করলে জনস্বার্থ ব্যাহত হতে পারে, তিনটি অর্গানের মধ্যে দ্বন্দ্ব হতে পারে- এই বিবেচনাটুকু সকল পক্ষের থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া। এখানে কিন্তু আমাদের কোনো ক্ষমতা নেই। সংবিধানেই আছে রাষ্ট্রপতি যখন বিচারপতি নিয়োগ দেন, তখন তিনি প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে নিয়োগ দেন। এখানে কোনো কিছু হলে আমি মনে করি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমাধান করাটাই ভালো। এ নিয়ে আমাদের মাঝে দ্বন্দ্ব হোক, তা চাই না। বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের বিষয়ে জনগণের মাঝে যাতে ভুল ধারণা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আমি মনে করি যে কোনো বিষয় উঠলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত।

 

শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে কোনো রকম দ্বন্দ্ব না চাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এরকম হলে তা জনগণের জন্য ভালো হবে না, বিচার বিভাগের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। যে কোনো বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত্ এবং সেটা সেভাবেই বিবেচনা করে দেখা উচিত্ বলে আমি মনে করি। সংসদ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের নিজ নিজ ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটানোর ক্ষেত্রে জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করার উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে জনস্বার্থকে বিবেচনায় রাখতে হবে। জাতীয় সংসদের প্রণয়ন করা আইন উচ্চ আদালতে বাতিল করে দেওয়া নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে শেখ হাসিনা এ   ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের সুবিবেচনা প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, আমরা যখন একটি আইন প্রণয়ন করি, তখন এই আইনটা দীর্ঘ পথ পরিক্রম করে আসে। আমরা হটাত্ করে পার্লামেন্টে আইন পাস করি না। কোনো আইন করাই হয় জনগণের স্বার্থে। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী এবং জাতির পিতার বিচার সম্পন্ন করে জাতিকে অভিশাপমুক্ত করতে সহযোগিতার জন্য বিচারপতিদের ধন্যবাদ জানান।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিচারকদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিতে হয়। বিএনপি দুইজন বিচারককে বোমা মেরে হত্যা করেছে। কাজেই বিচারপতিদের নিরাপত্তার বিষয়টাও আমরা চিন্তা করি। শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের বিচার বিভাগকে আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। এখানে বসেই ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে যেন বিচারকার্য করা যায়। তিনি বলেন, যারা দুর্ধর্ষ আসামি তাদের আদালতে আনা একটি কঠিন কাজ। ইতোমধ্যেই আসামি ছিনতাইয়ের চেষ্টাও হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেরাণীগঞ্জে যে জেলখানা করা হয়েছে, সেখানে আমি নির্দেশ দিয়েছি আদালতের জন্য বিশেষ রুম করে দেওয়ার জন্য। যেন ঢাকা থেকে বসেও ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ওখানে বিচারকার্য পরিচালনা করা যায়।

 

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিচারপতিদের জন্য নির্মিত প্রায় দেড় একর জমির ওপর আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত ২০ তলা ভবনের উদ্বোধন করেন। সেখানে ৩৬শ’ বর্গফুটের বেশি আয়তন সম্বলিত ৭৬টি ফ্লাট রয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা, এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক এবং গণপূর্ত সচিব মো. শহীদুল­াহ খন্দকার বক্তব্য রাখেন।

 

‘ন্যাম ফ্লাট নিয়ে না থাকলে বরাদ্দ বাতিল’

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদ সদস্যদের ন্যাম ফ্লাট ব্যবহারে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যেসব সংসদ সদস্য ন্যাম ফ্লাট বরাদ্দ নিয়ে সেখানে থাকছেন না, তাদের বরাদ্দ বাতিল করা হতে পারে। তিনি বলেন, ‘যারা নিজেরা থাকবেন, তাদের নামেই ন্যাম ফ্লাট ধাকবে। গতকাল শনিবার রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য নবনির্মত ভবনসমূহের উদ্বোধনকালে প্রধান অথিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

 

গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আসম ফিরোজ, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. আব্দুর রব হাওলাদার এবং গণপূর্ত সচিব মো.শহীদুল­াহ খন্দকার বক্তব্য রাখেন। ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, জাতীয় সংসদের হুইপবৃন্দ, জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

 

০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

 

একটি মহল দূরত্ব তৈরির অপচেষ্টায় লিপ্ত :প্রধান বিচারপতি

 

ইত্তেফাক রিপোর্ট

 

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, কিছুদিন আগে সরকার বিচার বিভাগ সংক্রান্ত তিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে বিচার বিভাগের অভিভাবক হিসেবে প্রধান বিচারপতিকে কোনো কিছুই অবহিত করা হয়নি। সম্পূর্ণ ভুল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সরকার প্রধানের কাছে সত্য গোপন করে সিদ্ধান্তগুলো হাসিল করা হয়েছে। এরকম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করা হলে ভুল বোঝাবুঝি হতো না। তিনি বলেন, একটি মহল সবসময় সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে দূরত্ব তৈরির অপচেষ্টায় লিপ্ত আছে। এরকম ভুল বোঝাবুঝির কারণে দেশের সাধারণ জনগণের কাছে ভুল বার্তা যায়। গতকাল শনিবার রাজধানীর কাকরাইলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের জন্য ২০ তলা আবাসিক ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই আবাসিক ভবনের উদ্বোধন করেন। পরে তিনি ভবনের বিভিন্ন তলা ঘুরে দেখেন। দেড় একর জায়গায় ১৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৬টি ফ্ল্যাটের এই ভবন নির্মাণ করেছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

 

প্রধান বিচারপতি বলেন, আইন ও বিধি বিধানের অসঙ্গতিকে দূর করে বিচার বিভাগে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বিচার বিভাগ অনেক বেশি সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করছে। বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় মুহূর্তে সবসময় এর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেল হত্যা মামলাসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত মামলা, সন্ত্রাস নিরোধ, পরিবেশ রক্ষা, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নিরসনসহ সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ এর ভূমিকা রেখেছে যা রাষ্ট্রের অন্য কোনো অঙ্গ, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান পালন করেনি। ফলে বিচার বিভাগের রাষ্ট্রের অন্য অঙ্গের ভুল বোঝাবুঝির কোনো সুযোগ নেই। আমি আশা করবো স্বাধীনতার স্বপক্ষের এ সরকার দেশের আইনের শাসনকে সমুন্নত করতে বিচার বিভাগকে আরও শক্তিশালী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে সবসময় সহযোগিতা করবে।

 

প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার বিভাগের দক্ষতা ও স্বাধীনতার ওপর একটি দেশের সভ্যতার চরিত্র পরস্ফুিট হয়ে ওঠে। অন্য কথায় বলা যায় যে, কোনো দেশের সরকারের কৃতিত্ব পরিমাপ করার সর্বোত্তম মাপকাঠি হচ্ছে তাঁর বিচার বিভাগের যোগ্যতা ও স্বাধীনতা। রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য নীতির প্রতিফলন হচ্ছে সংবিধানের মূল চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বিচার বিভাগ দেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। প্রত্যেক বিভাগকে দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কখনও কখনও দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে অপরিহার্যভাবে শীতল সম্পর্কের সৃষ্টি হতে পারে। তবে এ সম্পর্ককে ইতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করলে- প্রত্যেক বিভাগের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রভূত কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট যে কোনো ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম। এ কারণে আমরা বিচার বিভাগের ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প হাতে নিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে প্রকল্পটি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

 

প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি ভারত সফরকালে সেদেশের প্রধান বিচারপতি এবং প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের বিচারকদের প্রশিক্ষণের অনুরোধ করেছিলাম। ওই অনুরোধে ভারত সরকার সাড়া দিয়েছে। আপনার (প্রধানমন্ত্রী) সাম্প্রতিক ভারত সফরকালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমির সাথে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের জন্য যে প্রশিক্ষণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে সেজন্য আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় এ দেশের নিম্ন আদালতের ১৫০০ বিচারক ভারতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবে।