আজ  সোমবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৮

পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এদেশের মাটিতে জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধীদের স্থান হবে না পুলিশকে জনবান্ধব হয়ে কাজ করতে হবে পুলিশকে আইনের রক্ষকের ভূমিকায় দেখতে চাই

Police-2
অনলাইন ডেস্ক ঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশ সদস্যদের নিজেদেরকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘পুলিশকে আমি সবসময় আইনের রক্ষকের ভূমিকায় দেখতে চাই। দেশের প্রচলিত আইন, সততা ও নৈতিক মূল্যবোধই হবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পথনির্দেশক। আপনাদের মনে রাখতে হবে সফলতার জন্য আপনারা যেমন পুরস্কৃত হবেন, তেমনি প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।’ গতকাল সোমবার সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্স রাজারবাগে পুলিশ সপ্তাহ ২০১৮ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী  সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের জিরো টলারেন্স অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে আরো বলেন, এ দেশের মাটিতে জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধীদের স্থান হবে না। আমরা জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ বিস্তার রোধে তৃণমূল পর্যায়ে পরিবার, নারী, যুবসমাজ, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে  গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেতে চাই।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি। একজন সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। পুলিশ সদস্যদের নিজেদেরকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ যত সমৃদ্ধ হবে, দেশকে আমরা তত উন্নত করে করে তুলতে সক্ষম হবো। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমরা চাই বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য মুক্তভাবে গড়ে তুলব। কারো কাছে হাত পেতে নয়, মাথা নত করে নয়, মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি হিসেবে আমরা মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে চলতে চাই।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আশা করি, প্রতিটি পুলিশ সদস্য অসহায় ও বিপন্ন মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করবেন এবং সাহায্যের হাত বাড়াবেন। জাতির পিতা আপনাদের বলেছেন, আপনারা স্বাধীন দেশের পুলিশ। জনগণের প্রতি আপনাদের কর্তব্য অপরিসীম। তাই আপনাদের নিজেদেরকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশকে আমি সব সময় আইনের রক্ষকের ভূমিকায় দেখতে চাই। দেশের প্রচলিত আইন, সততা এবং নৈতিক মূল্যবোধই হবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পথ নির্দেশক।’ তিনি বলেন, আপনাদের মনে রাখতে হবে- সফলতার জন্য আপনারা যেমন পুরস্কৃত হবেন, তেমনি প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ইতোমধ্যে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে ‘আইজিপি কমপ্লেইন সেল’ স্থাপন করা হয়েছে যা পুলিশ সদস্যদের পেশাগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

 

মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে প্রধানমন্ত্রী এ সময় পুলিশের দক্ষতার প্রশংসা করে বলেন, পুলিশ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিককে আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদানে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে। ১০ লাখ মানুষ আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের তথ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

 

এ সময় বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে নতুন পদ সৃজন এবং পুলিশের জনবল বৃদ্ধিতে তাঁর সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, পুলিশের আবাসন, রেশন, চিকিত্সা সুবিধা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং প্রয়োজনীয় যানবাহন ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহের বিষয়টিও আমাদের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। পুলিশের জন্য স্টাফ কলেজও আওয়ামী লীগ সরকারই করেছে। পুলিশের সার্জেন্ট পদে নারী সদস্য নিয়োগসহ সুযোগ-সুবিধা এবং পদ মর্যাদা বৃদ্ধিতে তাঁর সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগও এ সময় প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ব্যক্তির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত ও জোরদারের লক্ষ্যে আমাদের সরকার বিশেষায়িত ‘গার্ড এন্ড প্রটেকশন পুলিশ’ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা করেছে। সেই সঙ্গে সারাদেশে মেট্রোপলিটন সিটিগুলোতে বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো বাড়ানোসহ নতুন থানা ও ইউনিট গঠন অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ পদক ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদকে ভূষিতদেরকেও তাঁর ভাষণে অভিন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ পদক আপনাদের কাজের স্বীকৃতির পাশাপাশি আপনাদেরকে ভবিষ্যতেও আরও পেশাদারিত্ব এবং আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করবে, এটাই আমার প্রত্যাশা।

 

বক্তৃতার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, কারা অভ্যন্তরে নিহত জাতীয় চারনেতা, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ এবং সম্ভ্রমহারা ২ লাখ মা-বোনকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে জাতির পিতার উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনাকারী পুলিশ সদস্যদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

 

প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সপ্তাহ ২০১৮ উপলক্ষে মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেন এবং একটি খোলা জীপে করে প্যারেড পরিদর্শন করেন। সুপারিনটেন্ডেন্ট অব পুলিশ মহসিন হোসেন প্যারেড পরিচালনা করেন। ‘জঙ্গিবাদ মাদকের প্রতিকার বাংলাদেশ পুলিশের অঙ্গীকার’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে এবারের পুলিশ সপ্তাহ উদযাপিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সকালে রাজারবাগ প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, পুলিশের আইজিপি একেএম শহীদুল হক এবং স্বরাষ্ট্র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন তাঁকে স্বাগত জানান। মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, জাতীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ এবং সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, কূটনৈতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ১৮২ জনকে ৪টি ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশ পুলিশ পদক সাহসিকতা, রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক সাহসিকতা, বাংলাদেশ পুলিশ পদক সেবা ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক সেবা প্রদান করেন। এরমধ্যে মরণোত্তর বাংলাদেশ পুলিশ পদক সাহসিকতা’র জন্য সিলেটের আঁতিয়া মহলে জঙ্গি বিরোধী অভিযানে নিহত লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ, ইন্সপেক্টর মো. মনিরুল ইসলাম এবং ইন্সপেক্টর কায়সরের পক্ষে তাঁদের সহধর্মিণীগণ প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে এই পদক গ্রহণ করেন।