আজ  মঙ্গলবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৮

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণার মান্ডেট ভোটের মাধ্যমে পেয়েছিলেন : প্রধানমন্ত্রী ৭ মার্চের ভাষণের উপর আলোচনা

1489163517আইএনএন২৪বিডিডটকম :  প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, স্বাধীনতা ঘোষণার ম্যান্ডেট একমাত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভোটের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। জাতির পিতার প্রত্যেকটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সুচিন্তিত ছিল বলেই দুটি স্বাধীনতা এনে দিতে সক্ষম হন। মাত্র ৫৪ বছর বয়সেই বঙ্গবন্ধু প্রথমে পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশ এই দুটি স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। তিনি বলেন, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীরা মনগড়া ইতিহাস দিয়ে পচাত্তর পরবর্তী প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করেন। দীর্ঘ ২১ বছর দেশবাসীকে বিকৃত ইতিহাস শুনতে হয়েছে। এই সময়ে দেশে বঙ্গবন্ধুর নাম, ছবি প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। আসলে পচাত্তরের খুনি, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীদের মধ্যে কোন তফাত্ নেই। ইতিহাস বিকৃতি প্রতিরোধে সকলকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

 

গতকাল শুক্রবার বিকালে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের ওপর আয়োজিত সেমিনারে সভাপতির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এই সেমিনারের আয়োজন করে।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্যেই আপনারা ইতিহাস পাবেন। মূলত ভাষণটি ছিলো ২৩ মিনিটের। আমার  সৌভাগ্য হয়েছিলো সেই সময় মাঠে উপস্থিত ছিলাম। মঞ্চের সামনে নয়, ঠিক পাশেই। যেটা রেকর্ড করা হয়েছিলো সেটা ১৯ মিনিটের রেকর্ড। সেই ভাষণে গেরিলা যুদ্ধের সার্বিক প্রস্তুতি বিষয় ছিল। এমনকি তিনি যদি না থাকতে পারেন বা হুকুম দিতে নাও পারেন তখন কি করতে হবে সেই কথাগুলোও তিনি বলে গেছেন। তিনি বলেন, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের  ভাষণ বাজানো নিষিদ্ধ ছিল। তারপরও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেখানে যেখানে সুযোগ পেয়েছে তারা প্রতি বছর ৭ মার্চের এই ভাষণ বাজাতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিল এবং অনেককে জীবনও দিতে হয়েছিল। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের তাত্পর্য তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ৭ মার্চেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন জাতির পিতা। ৪৬টি বছর ধরে বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণটি জনগণকে উজ্জীবিত করে যাচ্ছে। পৃথিবীর আর কোন ভাষণ নেই যে ভাষণটি এতো বছর ধরে মানুষ শুনছে, যার আবেদন এখনও এতটুকুও কমেনি। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু সব সময় বলতেন আমরা সংখ্যাগরিস্ট। আর সংখ্যাগরিস্টরা কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত এবং এই ভূ-খন্ডের নাম যে বাংলাদেশ হবে সেটাও বঙ্গবন্ধু ঠিক করে দিয়েছিলেন। জয় বাংলা স্লোগান মাঠে নিতে ছাত্রলীগকে নির্দেশ দিয়েছিলেন জাতির পিতা।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর দেশবাসী স্বাধীনতার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। পৃথিবীর কোন দেশ এত সফল অসহযোগ আন্দোলন করতে পারেনি। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু একটানা কখনো ২ বছর জেলের বাইরে থাকেননি। তার মহান আত্মত্যাগ সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরির্তনের জন্য ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাত্র মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তিনি যুদ্ধাবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলেন। তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে কত বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে তা পরবর্তীতে অনেকে উপলদ্ধি করেন। আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে নেই। তবে তিনি অমর, অব্যয়, অক্ষর। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে বঙ্গবন্ধুকে কেউ মুছে ফেলতে পারবে না।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগ্রামে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু চিরদিন এই বাঙালি জাতির হূদয়ে থাকবেন। তিনি বলেন, আমাদের নতুন প্রজন্ম যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, যারা হয়তো ৭৫ এর কিছু পূর্বে জন্ম নিয়েছে, তার মধ্য দিয়ে যারা বড়ো হয়ে উঠেছে, ৭ মার্চের ভাষণের তাত্পর্য তাদের মধ্যে তুলে ধরা উচিত। এ কাজে উদ্যোগী হওয়ার জন্য তিনি সেমিনারের আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাত্তরে পহেলা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ মনে হয়েছিল বাঙালি জাতি যেনো তার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একাট্টা হয়ে গিয়েছিল। ভাষণের প্রেক্ষাপটের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মঞ্চ দেখলেও বুঝবেন, তেমন কোনো প্রস্তুতি ছিল না। একটা উচু মঞ্চ আর একটা মাইক। অথচ, ওই ভাষণের জন্য আমাদের অনেক জ্ঞানী গুণী নেতা, বুদ্ধিজীবিরা কেউ চিরকুট দিচ্ছিলেন, কেউ বলে যাচ্ছিলেন, নেতা এটা করতে হবে-এটা বলতে হবে। বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, এখানে আমি বলবো, সব থেকে বড়ো অবদান আমার মায়ের। আমার মা কিন্তু জনসম্মুখে আসেন নি। আমার মা ওইসময় আব্বাকে বলেছিলেন, অনেকে অনেক কিছু বলে দিয়েছে, লিখে দিয়েছে, কিন্তু তুমি জানো কী বলতে হবে। তুমি জানো একমাত্র তুমি জানো তোমার মনে ঠিক যে কথাগুলো আসবে তুমি ঠিক সেই কথাগুলোই বলবে। আমার মনে আছে, আব্বা মায়ের কথা শুনে মৃদু হাসলেন তারপর মাঠের দিকে রওয়ানা করলেন। পিছন পিছন আমি আর রেহানা আরেকটা গাড়িতে গেলাম।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাষণ শেষ করে উনি যখন আসলেন, তখন মানুষে মানুষে সয়লাব ছিল এলাকা। আমি যখন ঘরের মধ্যে ঢুকলাম, ঠিক সেইসময় দেখি, আমাদের কতোজন ছাত্রনেতা হঠাত্ দেখি বেশ উত্তেজিত। তারা বলছেন, লিডার এটা কী করলেন আপনি, স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে আসলেন, সবাই খুব হতাশ। আমি তখন বললাম, আপনারা এরকম মিথ্যা কথা বলেন কেনো, আমি মানুষের মধ্যে যে উত্সাহ উদ্দীপনা দেখে আসলাম, সেখানে কিন্তু কোনো হতাশা দেখি নি। আমি বললাম, আব্বা আপনি এদের কথা বিশ্বাস করবেন না। আমি নিজে দেখে আসলাম, মানুষ শ্লোগান দিতে দিতে উত্ফুল্ল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে শহরে। শেখ হাসিনা বলেন, আমি এখন মনে করি, তারা ওই কথা ওইদিন কেনো বলেছিল, এটা নিয়ে এখন চিন্তা করার আছে। তাহলে তারা কাদের হয়ে ওই কথা বলেছিল। কারণ বঙ্গবন্ধু তো জানতেন কিভাবে মানুষের মুক্তি আসবে।

 

স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়ে তিনি বলেন, স্বাধীনতা ঘোষণার যে বাণীটা আপনারা পান সেটা আগেই প্রস্তুত করা ছিল। এখন ৩২ নাম্বারের বাড়ির লাইব্রেরিতে যে টেলিফোনটা আছে। সেই টেলিফোন দিয়ে শওকত সাহেবের কাছে সেটা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাদের নির্দেশ দেওয়া ছিল, আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে বার্তাটা সারাদেশে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। বার্তাটা দেওয়ার পরপরই তারা আমদের বাড়িতে আক্রমণ করে এবং বঙ্গবন্ধুকে ধরে নিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানীরা আক্রমণের আগেই বঙ্গবন্ধু জনমত নিয়ে নিয়েছিলেন। যে কারণে তিনি ১৯৭০ এর নির্বাচনে অংশ নেন। যদিও ৭০ এর নির্বাচনের আগে অনেকে বাধা দিয়েছিল, কিন্তু তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের নেতা কে—এটা জনগণ আগে ঠিক করে দিক। ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিনি জনমতটা নিয়ে নিয়েছিলেন।

 

‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ: রাষ্ট্র ও সামজ কাঠামো পরিবর্তনের দিকদর্শন’ শীর্ষক এই সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী মাসরুবা হোসেন, সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের পরিচালক মো. এ আরাফাত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জিন্নাত হুদা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টেও সদস্য সচিব কবি শেখ হাফিজুর রহমান। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান।