আজ  সোমবার, ২০ আগস্ট, ২০১৮

মহাকাশে বাংলাদেশ আজই উড়বে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট

অনলাইন ডেস্ক:
এক নজরে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১

589

ওজন তিন দশমিক ৭ মেট্রিক টন **  মহাকাশে অবস্থান করবে ১৫ বছর ** সর্বমোট খরচ ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা ** সরকারি অর্থ ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা, বিদেশি অর্থায়ন ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ** নিজস্ব কক্ষপথ ১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে স্থাপন করা হবে * স্যাটেলাইটটি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ২০ দিন লাগবে ** গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায়

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আজ বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মহাকাশে স্বপ্নযাত্রা শুরু করবে বাংলাদেশের ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট’। এই স্যাটেলাইট উেক্ষপণের সঙ্গে সঙ্গে মর্যাদার আসনে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। স্যাটেলাইট উেক্ষপণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থান করা বাংলাদেশিদের মধ্যে এখন চলছে উত্সবের আমেজ। তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের নেতৃত্বে ৩০ সদস্যের একটি সরকারি প্রতিনিধি দল সেখানে অবস্থান করছে। আগামী ১৫ বছরের জন্য মহাকাশের স্থায়ী বাসিন্দা হবে ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট’। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’ এর ফ্যালকন-৯ রকেট ফ্লোরিডার কেইপ কেনাভেরালের লঞ্চিং প্যাড থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে নিয়ে মহাকাশের পথে উড়াল দেবে।
গতকাল বুধবার রাতে ফ্লোরিডা থেকে তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম ইত্তেফাককে বলেন, উেক্ষপণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে সব কিছু ঠিক আছে। আমরা আশা করছি বৃহস্পতিবার উেক্ষপণ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ দেখতে আগ্রহীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’ ফ্লোরিডার স্থানীয় সময় ১০ মে বিকাল ৪টা ১২ মিনিট থেকে ৬টা ২২ মিনিটের মধ্যে (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ২টা ১২ মিনিট থেকে ৪টা ২২ মিনিট) বঙ্গবন্ধু-১ এর উেক্ষপণের সময় ঠিক করেছে বলে কেনেডি স্পেস সেন্টারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, প্রথমবারের মতো ফ্যালকন-৯ রকেটের ব্লক ৫ সংস্করণ বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট নিয়ে জিওস্টেশনারি ট্রান্সফার অরবিটের পথে ছুটবে।
সারা দিনের জন্য টিকিট কেটে আগ্রহীরা লঞ্চ প্যাড থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৯ মাইল দূরে অ্যাপোলো/স্যাটার্ন ভি সেন্টার এবং প্রায় সাড়ে ৭ মাইল দূরে কেনেডি স্পেস সেন্টারের মূল ভিজিটর কমপ্লেক্স থেকে এই উেক্ষপণ দেখার সুযোগ পাবেন। অ্যাপোলো/স্যাটার্ন ভি সেন্টারে যাওয়া যাবে শুধু কেনেডি স্পেস সেন্টারের বাসে চড়ে এবং সেটা ধারণক্ষমতা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত খোলা থাকবে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রওনা হওয়ার আগে ইত্তেফাককে বলেছেন, সব প্রস্তুতি নেওয়া হলেও এসব ক্ষেত্রে আবহাওয়া এবং কারিগরি বিষয়গুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। বহু ঘটনা আছে, যেখানে কাউন্ট ডাউনের একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়েও উেক্ষপণ স্থগিত করতে হয়েছে। গত ৪ মে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে এই রকেটের স্ট্যাটিক ফায়ার টেস্ট সম্পন্ন হয়। তিন হাজার ৭০০ কেজি ওজনের জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ কে নিয়ে ফ্যালকন-৯ কক্ষপথের দিকে ছুটবে কেনেডি স্পেস সেন্টারের ঐতিহাসিক লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯-এ থেকে। এই লঞ্চ কমপ্লেক্স থেকেই ১৯৬৯ সালে চন্দ্রাভিযানে রওনা হয়েছিল অ্যাপোলো-১১।
১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় দেশের প্রথম ভূ-উপগ্রহকেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। তার উত্তরসূরি হিসেবে মহাকাশে যাচ্ছে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় নিবিড় তদারকির মাধ্যমে স্যাটেলাইট উেক্ষপণের কাজ শেষ করেছেন।
প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে মর্যাদার আসনে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। উেক্ষপণের এই দিনটি বাংলাদেশের জন্য অন্যরকম একটি দিন। ৬ বার তারিখ পরিবর্তনের পর এসেছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উেক্ষপণে ‘স্যাটেলাইট সিস্টেম’ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়। এর জন্য ২ হাজার ৯৬৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা খরচ ধরা হয়। এর মধ্যে সরকারি অর্থ ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা। আর বিদেশি অর্থায়ন ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। যদিও শেষ পর্যন্ত স্যাটেলাইট উড়াতে সর্বমোট খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।
বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট তৈরি হয়েছে ফ্রান্সের থ্যালাস এলিনিয়া স্পেস ফ্যাসিলিটিতে। তৈরি, পরীক্ষা, পর্যালোচনা ও হস্তান্তর শেষে বিশেষ কার্গো বিমানে করে সেটি কেইপ কেনাভেরালের লঞ্চ সাইটে পাঠানো হয়। এটা নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে ১ হাজার ৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের প্রকল্প পরিচালক মো. মেজবাহুজ্জামান জানান, ফ্যালকন-৯ রকেটে চারটি অংশ রয়েছে। ওপরের অংশে থাকবে স্যাটেলাইট, তারপর অ্যাডাপটর। এরপর স্টেজ-২ এবং সবচেয়ে নিচে থাকে স্টেজ-১। তিনি বলেন, এ উেক্ষপণ দেখতে হলে আগ্রহীদের উেক্ষপণ স্থানের তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে অবস্থান নিতে হবে। সাত মিনিটের কম সময় দেখা যাবে, তার পরপরই উচ্চগতির রকেট চলে যাবে দৃষ্টিসীমার বাইরে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর রকেটের স্টেজ-১ খুলে নিচের দিকে নামতে থাকে, এরপর চালু হয় স্টেজ-২। পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্টেজ-১ পৃথিবীতে এলেও স্টেজ-২ একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত স্যাটেলাইটকে নিয়ে গিয়ে মহাকাশেই থেকে যায়।
দুইটি ধাপে এই উেক্ষপণ প্রক্রিয়া শেষ হয় জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রথম ধাপটি হলো লঞ্চ অ্যান্ড আরলি অরবিট ফেইজ (এলইওপি) এবং দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে স্যাটেলাইট ইন অরবিট। এলইওপি ধাপে ১০ দিন এবং পরের ধাপে ২০ দিন লাগবে। উেক্ষপণ স্থান থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে যাবে এই স্যাটেলাইট। ৩৫ হাজার ৭০০ কিলোমিটার যাওয়ার পর রকেটের স্টেজ-২ খুলে যাবে। স্যাটেলাইট উন্মুক্ত হওয়ার পরপর এর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশনে চলে যাবে। এই তিন স্টেশন থেকে স্যাটেলাইটটিকে নিয়ন্ত্রণ করে এর নিজস্ব কক্ষপথে (১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল স্পট) স্থাপন করা হবে।
স্যাটেলাইটটি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ২০ দিন লাগবে। স্যাটেলাইটটি সম্পূর্ণ চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের গ্রাউন্ড স্টেশনে হস্তান্তর করা হবে। স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায়। দক্ষিণ কোরিয়া গত বছর ৩০ অক্টোবর একই স্থান থেকে একটি স্যাটেলাইট উেক্ষপণ করেছে। সেখানে কেটি বা কোরিয়ান স্যাটেলাইট লেখা ছিল। বাংলাদেশের স্যাটেলাইটটিও একইভাবেই উেক্ষপণ হবে। আমাদের স্যাটেলাইটে লেখা থাকবে বিবি এবং থাকবে একটি সরকারি লোগ।
সরকারের তরফ থেকে আশা করা হচ্ছে, বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ যে ১৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণের পর সেই অর্থ সাশ্রয় হবে। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো বিদেশি স্যাটেলাইট থেকে বর্তমানে সেবা নিচ্ছে। যার পেছনে এই বিপুল পরিমাণ ডলার বাইরে চলে যাচ্ছে। এই স্যাটেলাইট উেক্ষপণ হলে সেই অর্থ দেশেই থেকে যাবে। উল্টো বিদেশে ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনা সম্ভব হবে বলেও জানিয়েছেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ।
পাঁচ হাজার কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন নিয়ে ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ গঠন করা হয়েছে। এই কোম্পানি স্যাটেলাইটের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন সংস্থার (আইটিইউ) ‘রিকগনিশন অফ এক্সিলেন্স’ পুরস্কারও পেয়েছে।
বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ ১৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, সেই অর্থ সাশ্রয় হবে। বিদেশে ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনাও সম্ভব হবে।